Syed Rahat

 

পবিত্র কোরআন হতে: কখন কোথায় কিভাবে কথা বলতে হয়

প্রবন্ধকার: ✍️ছৈয়দ মশিউর রহমান রাহাত
হান আল্লাহর বাণী ও নবীজির শিক্ষা হলো, কথা বলার পূর্বে সালাম দেয়া।
فَاِذَا دَخَلۡتُمۡ بُیُوۡتًا فَسَلِّمُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِکُمۡ تَحِیَّۃً مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰهِ مُبٰرَکَۃً
অতঃপর যখন কোন ঘরে প্রবেশ করো তখন তোমাদের আপন লোকদের প্রতি সালাম করো। (সূরা নূর আয়াত ৬১)
সুতরাং যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করবে, তখন নিজেরাই নিজেদেরকে সালাম করো। ইহা আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতপূর্ণ এক অভিবাদন ও কতইনা চমৎকার অভ্যর্থনা।
শিষ্টাচার বহির্ভূত, অনর্থক ও বাজে কথা পরিহার করা।
وَ الَّذِیۡنَ هُمۡ عَنِ اللَّغۡوِ مُعۡرِضُوۡنَ ﴿ۙ۳)
আর যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিমুখ। (সূরা মু'মিনুন, আয়াত ৩)
পূর্ণ মুমিনের করণীয় অনর্থক বিষয়াদি থেকে বিরত থাকা। لغو এর অর্থ অসার ও অনর্থক কথা বা কাজ।
মোটকথা: যেসব কথায় বা কাজে কোন লাভ হয় না, যেগুলোর পরিণাম কল্যাণকর নয়, যেগুলোর আসলে কোন প্রয়োজন নেই, যেগুলোর উদ্দেশ্যও ভালো নয় সেগুলোর সবই ‘বাজে’ কাজের অন্তর্ভুক্ত। যাতে কোন দ্বীনি উপকার নেই বরং ক্ষতি বিদ্যমান। এ থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।
ত্তমরূপে ও সুন্দরভাবে কথা বলা।
وَ قُوۡلُوۡا لِلنَّاسِ حُسۡنًا
এবং মানুষের সাথে সদালাপ কর। (সূরা বাক্বারা আয়াত ৮৩ অংশবিশেষ)
'সদালাপ' অর্থ মানুষের সাথে কথা বলার সময় সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় কথা বলা। সৎ কার্যাবলীর দিকে উৎসাহ প্রদান এবং অসৎ কার্যাদি থেকে বাধা দেয়া।
অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক আরো তাকিদ দিয়ে বলেন,
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ
অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বল, হয়তো সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে। ( সূরা ত্ব-হা, আয়াত-৪৪)
বের সেরা সৃষ্টি মানুষ। আর সে মানুষের সাথে কথা বলার সময় চেহারা বক্রাকার ও অহংকারী হইও না।
وَ لَا تُصَعِّرۡ خَدَّکَ لِلنَّاسِ وَ لَا تَمۡشِ فِی الۡاَرۡضِ مَرَحًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ کُلَّ مُخۡتَالٍ فَخُوۡرٍ ﴿ۚ۱۸﴾
অন্য কারো সাথে কথা বলার মধ্যে * আপন মুখমন্ডল বক্র করো না * এবং পৃথিবীতে অহংকার করে বিচররণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না কোন উদ্ধত, অহংকারীকে। (সূরা লোক্বমান, আয়াত১৮)
অহংকারের সূত্রে অর্থাৎ মানুষ যখন কথা বলে তখন তাদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তাদের দিক থেকে চেহারা ফিরিয়ে নেয়ার মতো অহংকারী লোকদের পন্থা অবলম্বন করো না। নম্রতার সাথে লোকদের সম্মুখীন হও।
ব্বুল আলামীনের দ্বীনের দাওয়াত দিতে সুন্দর উপদেশ,বুদ্ধি, হেকমত ও কৌশল খাটিয়ে কথা বলুন।
اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَ الۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ وَ جَادِلۡهُمۡ بِالَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ رَبَّکَ هُوَ اَعۡلَمُ بِمَنۡ ضَلَّ عَنۡ سَبِیۡلِهٖ وَ هُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُهۡتَدِیۡنَ ﴿۱۲۵﴾ادع الی سبیل ربک بالحکمۃ و الموعظۃ الحسنۃ و جادلهم بالتی هی احسن ان ربک هو اعلم بمن ضل عن سبیلهٖ و هو اعلم بالمهتدین ﴿۱۲۵﴾
তুমি, তোমরা রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। নিশ্চয় একমাত্র তোমার রবই জানেন কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হেদায়াতপ্রাপ্তদের তিনি খুব ভাল করেই জানেন। (সূরা আন্ নাহাল, আয়াত ১২৫)
বুদ্ধিমত্তা, হেকমত ও সুন্দর সুন্দর উপদেশ প্রয়োগের মাধ্যমে সর্বোপরি চাতুর্যের সাথে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত পেশ করুন।
ক্ব কথা বলা ও পাপ মোচনের দোয়া উন্মুক্ত করা। আহযাব ৭০-৭১
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ قُوۡلُوۡا قَوۡلًا سَدِیۡدًا ﴿ۙ۷۰﴾
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সরল কথা বলো (সূরা আহযাব, আয়াত ৭০)
یُّصۡلِحۡ لَکُمۡ اَعۡمَالَکُمۡ وَ یَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَ مَنۡ یُّطِعِ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِیۡمًا ﴿۷۱﴾
তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য সংশোধন করে দেবেন *এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। আর যে কেউ আল্লাহ ও রছুলের আনুগত্য করে সে মহা সাফল্য লাভ করেছে। (সূরা আহযাব, আয়াত ৭১)।
'সরল' অর্থাৎ সত্য ও সঠিক এবং হক্ব ও ইনসাফের। আর আপন রসনা ও কথাবার্তার হেফাজত করো। এটা সৎ কর্ম সমূহের মূল উৎস।এমন করে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি দয়াপরবশ হবেন এবং * তোমাদের সৎ কার্যাদির তৌফিক দেবেন এবং তোমাদের ইবাদত বন্দেগী কবুল করবেন।
মানুষের প্রতি ক্ষমা নীতি অবলম্বন করে কথা বলা।
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোল, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাক। (সূরা আরাফ, আয়াত-১৯৯)
অতএব, পরিবারের, সমাজের সকল স্তরের মানুষের প্রতি ক্ষমা নীতি অবলম্বন করুন।
ব্য ফিৎনার এ সময় মেয়েরা পর পুরুষের সাথে আকর্ষণীয় ও কোমল ভাষায় কথা না বলা। (সূরা আহযাব,আয়াত ৩২)
یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِهٖ مَرَضٌ وَّ قُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ﴿ۚ۳۲﴾
হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। (সূরা আহযাব আয়াত ৩২)
রাছুলের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসীদের কথা ও কাজ এক হওয়া।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ
মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বল? (সূরা সাফফ, আয়াত ২)
كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ
তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক। সূরা সাফফ, আয়াত ৩)
হামেশা কথা বলার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা।(কেননা প্রতিটি কথা রেকর্ড হচ্ছে)
مَا یَلۡفِظُ مِنۡ قَوۡلٍ اِلَّا لَدَیۡهِ رَقِیۡبٌ عَتِیۡدٌ ﴿۱۸)
এমন কোন কথা-ই সে মুখ থেকে বের করে না যে, তার সন্নিকটে একজন রক্ষক উপবিষ্ট থাকে না। (সূরা ক্বা-ফ, আয়াত ১৮)
অন্যত্র মহান খালেক আরো সুন্দর করে বলেছেন
وَ کُلَّ اِنۡسَانٍ اَلۡزَمۡنٰهُ طٰٓئِرَهٗ فِیۡ عُنُقِهٖ ؕ وَ نُخۡرِجُ لَهٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ کِتٰبًا یَّلۡقٰىهُ مَنۡشُوۡرًا ﴿۱۳﴾و کل انسان الزمنه طئرهٗ فی عنقهٖ و نخرج لهٗ یوم القیمۃ کتبا یلقىه منشورا ﴿۱۳﴾
এবং প্রত্যেক মানুষের ভাগ্য আমি তার গ্রীবালগ্ন করে দিয়েছি* এবং তার জন্য ক্বিয়ামত দিবসে একটা লিপিবদ্ধ (কিতাব) বের করবো, যা তারা উন্মুক্ত পাবে*। (সূরা বনী ইস্রাইল আয়াত ১৩)
অর্থাৎ যা কিছু তার জন্য নির্ধারিত হয়েছে, ভালো কিংবা মন্দ, সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য, তা তার জন্য এমনি ভাবে অনিবার্য যে, যেমন গলার হার, সে যেখানে যায় সেখানেই তার সাথে থাকে, কখনো পৃথক হয়না।
তা হবে তার 'আমলনামা'(লিপিবদ্ধ/ কিতাব)
অতএব বুঝা গেল, মানুষ যত কথাই বলুক না কেন? স্বয়ংক্রিয় ভাবে ( অডিও ভিডিও সহকারে) সবই রেকর্ড করা হচ্ছে।
ত্বজ্ঞান শূন্য অজ্ঞ মূর্খদের সাধ্যমত এড়িয়ে চলা।
وَ عِبَادُ الرَّحۡمٰنِ الَّذِیۡنَ یَمۡشُوۡنَ عَلَی الۡاَرۡضِ هَوۡنًا وَّ اِذَا خَاطَبَهُمُ الۡجٰهِلُوۡنَ قَالُوۡا سَلٰمًا ﴿۶۳﴾
আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে ‘সালাম’। (সূরা ফুরকান আয়াত-৬৩)
(তুমিও ভাল থাকো, আমিও ভাল থাকতে চাই। তোমার সাথে অহেতুক ঝামেলা করতে চাই না।)
وَ الَّذِیۡنَ لَا یَشۡهَدُوۡنَ الزُّوۡرَ ۙ وَ اِذَا مَرُّوۡا بِاللَّغۡوِ مَرُّوۡا کِرَامًا ﴿۷۲﴾
আর যারা মিথ্যার সাক্ষ্য হয় না এবং যখন তারা অনর্থক কথা-কর্মের পাশ দিয়ে চলে তখন সসম্মানে চলে যায়। (সূরা ফুরকান, আয়াত-৭২)
শান্ত, নরম হৃদয়গ্রাহী ভাষায় কথা বলুন
وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ (19
পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কন্ঠস্বর নীচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার কণ্ঠস্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর। (সূরা লুকমান, আয়াত-১৯)
পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অর্থ- না খুব দ্রুতবেগে, না খুব অলসভাবে; কারণ এ উভয় পন্থাই মন্দ। একটার মধ্যে অহংকার প্রকাশ পায়, অপরটির মধ্যে ছেলেমী। আর গাধার মতো কর্কশ স্বরে কথা না বলা।
ক্ব কথা বলে শত্রুকেও বন্ধুতে পরিণত করা।
শত্রু মিত্র সবার সাথে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব পূর্ণ আচরণ করুন এবং উত্তম কথা বলে শত্রুকেও বন্ধুতে পরিণত করুন।যেমন আল্লাহ পাক বলেন
وَ لَا تَسۡتَوِی الۡحَسَنَۃُ وَ لَا السَّیِّئَۃُ ؕ اِدۡفَعۡ بِالَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ فَاِذَا الَّذِیۡ بَیۡنَکَ وَ بَیۡنَهٗ عَدَاوَۃٌ کَاَنَّهٗ وَلِیٌّ حَمِیۡمٌ ﴿۳۴﴾
আর ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত কর তা দ্বারা যা উৎকৃষ্টতর, ফলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে সে যেন হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। (সূরা হা-মীন সাজদাহ ৩৪)
আসুন পবিত্র কোরআনের আলোকে নিজের আচার-আচরণ ও কথা মালাকে সাজাই।

                    নায়েবে মোন্তাজেম, চট্টগ্রাম দরবার শরীফ, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।
                    প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, রাহে ভান্ডার ওলামা পরিষদ